সোমবার, আগস্ট ২, ২০২১
Homeজাতীয়কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা ও সমন্বিত নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ

কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা ও সমন্বিত নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ

দেশে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপারে একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষ থেকে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে নিয়মের মধ্যে আনার জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে জড়িতদের অনেকে বলেছেন, তাদের বেসরকারি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থাকার পরও সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।সরকার আসলে কী করতে চাইছে- সেটা মাদ্রাসার নেতৃত্ব বোঝার চেষ্টা করছেন।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগারি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তারা যেমন রয়েছেন, একইসাথে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার বেসরকারি বোর্ডের নেতাদেরও রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, কওমি মাদ্রাসাগুলোর কিছু প্রতিষ্ঠান এতিমখানা হিসাবে পরিচালিত হয়, আবার কিছু কিছু জায়গায় লিল্লাহ বোর্ডিং নামে পরিচালিত হয়। কিছু কিছু মাদ্রাসা হাইআতুল উলয়া বোর্ডের অধীনে তাদের সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায় হাদিস প্রদান করে। আবার কিছু জায়গায় নূরানী মাদ্রাসা বা হেফজোখানা রয়েছে। সেই ধাপগুলো কী প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হচ্ছে, এবং সেগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে বা কারা সেগুলোতে পড়াচ্ছে এবং কারা সেখানে পড়ছে- সেই তথ্য সরকারের কাছে থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, প্রতিদিনই এরা কোন অনুমোদন ছাড়া যত্রতত্র হেফজোখানা নামে সাইনবোর্ড তুলে দিচ্ছে। এই জিনিসগুলো আমরা মোটামুটি খতিয়ে দেখেছি। এখন আমরা কমিটির মাধ্যমে এটা একটা ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে আনবো, নিয়মনীতির মধ্যে আনবো।

‘সরকারি উদ্যোগ সাংঘর্ষিক’

কওমি মাদ্রাসাকে সরকারিভাবে নিবন্ধনের কোন ব্যবস্থা বাংলাদেশে নাই।মাদ্রাসার শিক্ষকরা নিজেরা শিক্ষাবোর্ড গঠন করে সিলেবাস এবং পরীক্ষার বিষয়গুলো পরিচালনা করেন। কিন্তু তাদের একক কোন বোর্ড নেই। বেফাকসহ তাদের ছয়টি বোর্ডের অধীনে মাদ্রাসাগুলো বিভক্ত।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার যখন কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ দাওরায় হাদিস ডিগ্রিকে মাস্টার্স এর মর্যাদা দিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসার ছয়টি বেসরকারি বোর্ডের নেতৃত্বকে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ একটি বোর্ড গঠন করে দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

সেই সর্বোচ্চ বোর্ডের সদস্য এবং হেফাজতে ইসলামের নেতা নুরুল ইসলাম জেহাদি বলেন, তাদের বোর্ডকে সরকার আগে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তার সাথে সরকারের এখনকার উদ্যোগ সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন তারা।

তিনি বলেন, আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিছেন। এবং এখানে আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ নামের সর্বোচ্চ বোর্ড করা হয়েছে। এটা ছয়টা বোর্ড নিয়ে করা হইছে। এটার ব্যাপারে সরকারি গেজেট আছে। সেই গেজেটে সর্বোচ্চ বোর্ডকেই নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়া হইছে। এই বোর্ডই সিলেবাস ঠিক করবে।এই স্বকীয়তা বা স্বাধীনতা দেয়া হয়। এর সাথে দেওবন্দের সিলেবাস যে রকম, সেভাবেই কওমি মাদ্রাসা চলবে। এখন যে চিঠিটা আসছে, সেই বিষয়ের সাথে এটা সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে।

‘মাদ্রাসা বোর্ডের জবাব’

অন্যদিকে মাদ্রাসার নিবন্ধন এবং সিলেবাস ঠিক করার ব্যাপারে সরকারি কমিটি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ বোর্ডের নেতৃত্বের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিল, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনার পর বোর্ড তাদের অবস্থান তুলে ধরে সরকারের চিঠির জবাবও দিয়েছে।

নুরুল ইসলাম জেহাদি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার স্বকীয় অবস্থানের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখনকার উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য কিনা-এই প্রশ্ন তাদের মাঝে উঠেছে। সেটাই তারা চিঠির জবাবে লিখেছেন।

তিনি বলেন, এই নিবন্ধন বা এসবতো স্কুল কলেজের জন্য। এটা মাদ্রাসার জন্য হওয়া উচিত নয়। যুগোপযোগী করার কথা যেটা তারা বলে, সেটাতো আমরা করেই যাচ্ছি। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষা এবং আমাদের মূল শিক্ষার কোন ক্ষতি হয়, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারবো না।

কওমি মাদ্রাসাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে এর অর্থের উৎস দেখা এবং সিলেবাস নির্ধারণ করা সহ সার্বিকভাবে নীতিমালা তৈরির সরকারি এই উদ্যোগকে মাদ্রাসা নেতৃত্ব ইতিবাচক হিসাবে নেয়নি।

‘সরকারি উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ’

কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক হয়েছে।সর্বশেষ গত মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় সংগঠনটির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সহ বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়।সে প্রেক্ষাপটে হেফাজতের অনেক নেতা জেলে গেছেন এবং সংগঠনটি চাপের মুখে রয়েছে।

ইসলাম বিষয়ক লেখক এবং গবেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন, মাদ্রাসার নেতৃত্ব যখন চাপের মুখে, তখন সরকার এমন উদ্যোগ নেয়ায় তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।এখানে একটা হচ্ছে নিবন্ধন এবং একটা তালিকার মধ্যে আনা। আরেকটা হচ্ছে এর সিলেবাস বা পাঠ্যতালিকা এবং সমন্বয় করা- এমন কিছু কমন বিষয় রাখা- যেটা নাগরিক হিসাবেও মানুষের দরকার। সরকারের দাবি বা বক্তব্য এরকম।

শরীফ মুহাম্মদ বলন, কিন্তু যখন করোনার জন্য মাদ্রাসা বন্ধ এবং কওমি মাদ্রাসার একটা প্যারালাল সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দের একটা বড় অংশ জেলে রয়েছে। এছাড়া মাদ্রাসাগুলোর দায়িত্বশীলদের ওপর একটা বড় চাপ বজায় রয়েছে। এরকম সময়ে এ ধরনের একটা পদক্ষেপ কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে ব্যাপক একটা সন্দেহ, সংশয় এবং অনাস্থার সৃষ্টি করেছে। সূত্র: বিবিসি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments